![]() |
মুমিন ও মুনাফিকের পার্থক্য কি? |
মুমিন ও মুসলমানের পার্থক্য | মুনাফিকের বৈশিষ্ট্য কয়টি ও কি কি | মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে পার্থক্যকারী ইবাদত কোনটি
মুমিন ও মুসলিম এ দুটির মধ্যে মৌলিক দৃষ্টিগত কিছু পার্থক্য রয়েছে । মুমিন শব্দটি এসেছে ইমান শব্দ হতে । ইমানের যে দাবি গুলো আছে, যেমন কালেমা নামাজ রুজা হজ্ব জাকাত ইসলামের আদেশ নিষেধ যা আছে সেগুলো যিনি পরিপূর্ণরূপে পালন করেন, তিনি হলেন মুমিন।
অন্যদিকে মুসলিম শব্দ এসেছে ইসলাম শব্দ হতে । ইসলামের দাবিগুলো যিনি পূরণ করেন, তিনি হলেন মুসলিম।
মুনাফিকের বৈশিষ্ট্য গুলোঃ
যারা নিফাকি করে তাদেরকেই মুনাফিক বলা হয়। নিফাকি ২ রকম ভাবে হতে পারে, ১-বিশ্বাসের নিফাকি অর্থাৎ বাহিরে দেখাবে সে মুসলিম কিন্তু অন্তরে সে আল্লাহ ও তার বিধানকে ঘৃণা করে।এ বেক্তি ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাবে।শুধু তাই নয় ইসলামের অতি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোন বিধানকে যে অপছন্দ করবে সেই ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে।সুতরাং সাবধান হওয়া উচিত ঐ মানুষদেরও যারা দাঁড়ি, মাথা ঢেকে রাখার রুমাল বা ইসলামের যে কোন জিনিষকে অপছন্দ করে।
২-আমল বা কর্মের নিফাকি। মুসলিমদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষ এই নিফাকিতে জড়িত।
রাসুল (সাঃ) বলেন, ৪টি স্বভাব যার মধ্যে থাকবে সে খাটি মুনাফিক। আর যার মধ্যে এ ৪টি স্বভাবের কোন একটি থাকবে তার মধ্যে নিফাকের একটি স্বভাব থাকবে যে পর্যন্ত না সে তা পরিহার করে।স্বভাব ৪টি হল,
১-তার কাছে কোন আমানত রাখা হলে, সে আমানতের খিয়ানত করে।
২-যখন সে কথা বলে, মিথ্যা বলে।
৩-যখন ওয়াদা বা চুক্তি করে, তখন তা ভঙ্গ করে।
৪-আর যখন ঝগড়া-বিবাদ করে, তখন অশ্লীল ভাষা প্রয়োগ করে।(বুখারি, মুসলিম)
কোরআন ও হাদিসে প্রকৃত মুমিনের পরিচয় ও সফল মুমিনের গুণাবলি বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে।
ইমান, ইয়াকিন, ইখলাস, তাকওয়া, তাজকিয়া ও ইহসান অর্জনের মাধ্যমে ইসলাম বা আত্মসমর্পণ সফল মুমিনের গুণাবলি। আল–কোরআনের শুরুতেই বিবৃত হয়েছে, ‘আলিফ লাম মিম! এই সেই মহাগ্রন্থ, যাতে সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই, এটি মুত্তাকিনদের জন্য পথনির্দেশ। যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস স্থাপন করে, সালাত কায়েম করে, আমি তাদের যে রিজিক-দৌলত দিয়েছি তা হতে তারা ব্যয় করে। আর যারা বিশ্বাস করে তারা আপনার প্রতি, অবতীর্ণ কিতাবের প্রতি আর যা অবতীর্ণ হয়েছে আপনার পূর্বে এবং তারা পরকালের প্রতি একিন তথা দৃঢ় বিশ্বাস রাখে। এরা এদের রবের পক্ষ থেকে হেদায়েতের ওপরে রয়েছে এবং এরাই সফলকাম।’ (সুরা–২ বাকারা, আয়াত: ১-৫, পারা: ১, পৃষ্ঠা ১)।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কোরআন মজিদে তাঁর প্রিয় বান্দাদের পরিচয় উল্লেখ করে বলেন, ‘দয়াময় আল্লাহর প্রকৃত বান্দা তারাই যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং তাদের যখন অজ্ঞ লোকে মূর্খতাসুলভ সম্বোধন করে তখনো তারা সালাম ও শান্তির বাণী বলে। তারা রাত্রি যাপন করে তাদের প্রতিপালকের উদ্দেশে সেজদায় অবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে ইবাদত–বন্দেগির মাধ্যমে এবং তারা বলে, “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের হতে জাহান্নামের শাস্তি বিদূরিত করুন; উহার শাস্তি তো নিশ্চিত বিনাশ! নিশ্চয়ই তা অস্থায়ী ও স্থায়ী আবাস হিসেবে নিকৃষ্ট!” আর যখন তারা ব্যয় করে তখন অপচয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না; বরং তারা মধ্যপন্থায় থাকে। তারা আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো ইলাহ বা মাবুদকে ডাকে না। আল্লাহ যার হত্যা নিষেধ করেছেন যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না। যারা এসব করে তারা শাস্তি ভোগ করবে, কিয়ামতের দিন তাদের শাস্তি দ্বিগুণ করা হবে এবং সেখানে তারা হীনাবস্থায় স্থিত হবে। তবে তারা নয়, যারা তওবা করে ইমান আনে ও সৎকর্ম করে। আল্লাহ এদের পাপ পুণ্যের দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন; আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। যারা তওবা করে ও সৎকর্ম করে, তারা সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর অভিমুখী হয়। আর যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না এবং অসার ক্রিয়াকলাপের সম্মুখীন হলে স্বীয় মর্যাদার সহিত তা উপেক্ষা করে চলে। আর যারা তাদের প্রতিপালকের নিদর্শন স্মরণ করিয়ে দিলে তার প্রতি অন্ধ ও বধিরের মতো আচরণ করে না এবং যারা প্রার্থনা করে, “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য এমন স্ত্রী ও সন্তানসন্ততি দান করুন যারা আমাদের জন্য নয়ন প্রীতিকর হবে এবং আমাদের মুত্তাকিদের ইমাম বানিয়ে দিন।” এদের প্রতিদান হিসেবে দেওয়া হবে জান্নাতের সুউচ্চ স্থান, যেহেতু তারা ছিল ধৈর্যশীল। তাদের সেখানে অভ্যর্থনা জানানো হবে অভিবাদন ও সালাম সম্ভাষণসহকারে; সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। আশ্রয়স্থল ও আবাসন হিসেবে তা কতই উৎকৃষ্ট!’ (সুরা-২৫ ফুরকান, আয়াত: ৬৩-৭৬)।
পবিত্র জীবনযাপনই সফলতার চাবিকাঠি। কোরআন মজিদের বাণী, ‘সফল হলো তারা যারা আত্মশুদ্ধি অর্জন করল, আর ব্যর্থ মনোরথ হলো তারা যারা নিজেকে কলুষ আচ্ছন্ন করল।’ (সুরা-৯১ শামস, আয়াত: ৯-১০)। ‘সাবধান! একমাত্র বিশুদ্ধ ধর্মকর্মই আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য।’ (সুরা-৩৯ জুমার, আয়াত: ৩)।
তাকওয়া বা পরহেজগারি বেশি আমল করাকে বলে না; বরং বদ আমল বা মন্দ কাজ পরিহার করে চলাই হলো তাকওয়া। প্রিয় নবীজি (সা.) বলেন, ‘তুমি এভাবে আল্লাহর ইবাদত করো যেন তুমি তাঁকে দেখছ, যদি তুমি তাঁকে দেখতে না–ও পাও; তবে অবশ্যই তিনি তোমাকে দেখছেন।’ (বুখারি, হাদিস: ৪৮)।
অন্তরের বিশ্বাসের প্রতিফলনই হলো সব ক্রিয়াকলাপ। একমাত্র চিত্তশুদ্ধির মাধ্যমেই সফলতা তথা ইহজগতে শান্তি ও পরজগতে মুক্তি লাভ সম্ভব। এরই জন্য সব ধর্মাচার, অনুশাসন, বিধিবিধান ও ইবাদত অনুশীলন।
মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী: বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতির যুগ্ম মহাসচিব
smusmangonee@gmail.com
