নিজের আত্মাকে যাবতীয় গুনাহ থেকে পরিশুদ্ধ রাখার নাম আত্মশুদ্ধি। আল্লাহতায়ালা মানবজাতিকে দেহ ও আত্মা এ দুয়ের সমন্বয়ে সৃষ্টি করেছেন। দেহের রয়েছে দুটি অবস্থা সুস্থতা ও অসুস্থতা। ঠিক তেমনি আত্মারও রয়েছে সুস্থতা ও অসুস্থতা। দেহ অসুস্থ হলে যেমন চিকিৎসার মাধ্যমে তাকে সুস্থ করার চেষ্টা করতে হয়, তেমনি আত্মা রোগাক্রান্ত হলে আত্মিক চিকিৎসার মাধ্যমে তাকে সুস্থ করে তুলতে হয়। আর একেই বলে আত্মশুদ্ধি বা তাজকিয়াতুন নফস।
আত্মশুদ্ধি দ্বীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আত্মশুদ্ধি ছাড়া মানুষের ইমান কখনো পরিপূর্ণ হয় না। সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আল্লাহতায়ালা তোমাদের বাহ্যিক রূপের দিকে তাকাবেন না; বরং তোমাদের অন্তরের দিকে তাকাবেন।' (সহিহ মুসলিম : ৪৬৫০)
হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, 'জেনে রাখো, শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরা আছে, তা যখন ঠিক হয়ে যায়, পুরো শরীরই তখন ঠিক হয়ে যায়। আর তা যখন খারাপ হয়ে যায়, পুরো শরীরই তখন খারাপ হয়ে যায়। জেনে রাখো, সেই গোশতের টুকরাটি হলো অন্তর (কলব)।' (সহিহ বোখারি : ৫২)
পবিত্র কোরআনের ১৩২টি আয়াতে বিভিন্ন প্রসঙ্গে কলব শব্দটি এসেছে। মূলত কলব মানে মন। একে বিশেষ কোনো সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করা অসম্ভব হলেও প্রিয়নবী (সা.) মানবদেহের একটি অঙ্গকে কলব বলে আখ্যায়িত করেছেন। আর সেই অঙ্গটিই হলো হৃৎপিণ্ড।
মানুষের দুটি দিক রয়েছে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ। ইসলাম যেমন মানুষের বাহ্যিক দিক সুন্দর করতে চায়, তেমনি অভ্যন্তরীণ দিকও কলুষমুক্ত করতে চায়। এখন প্রশ্ন হতে পারে, আত্মশুদ্ধি কেন দরকার? এ প্রসঙ্গে কোরআনের সুরা শামসের ৯-১০ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে, 'যে নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে সে সফলকাম। যে নিজের আত্মাকে কলুষিত করে সে ব্যর্থ।' অন্য স্থানে আল্লাহ আরও বলেন, 'যে ব্যক্তি প্রভুর সামনে দাঁড়ানোকে ভয় করে এবং নফসকে কুপ্রবণতা থেকে নিবৃত্ত রেখেছে, তার ঠিকানা হচ্ছে জান্নাত।' (সুরা নাজিয়াত : ৪০-৪১)
ইসলামি স্কলারদের মতে, আত্মশুদ্ধির পথ হলোÑ সহিহ দ্বীনি ইলমচর্চা, হালাল উপার্জন, যথার্থভাবে ফরজগুলো আদায়, আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি ও সর্বাবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ, মৃত্যু ও আখিরাতের চিন্তা, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ, সর্বাবস্থায় ও সব কাজে সুন্নতের অনুসরণ, সুন্দর চরিত্র ও আচরণ, সাহাবিদের জীবনী অধ্যয়ন, বেশি বেশি দোয়া, তওবা ও ইস্তেগফার, সৎ গুণাবলি অর্জন (ইখলাস, সততা, ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা, বিনয় নম্রতা, অন্যের উপকার, দয়ার অনুভূতি, অন্যের দোষত্রুটি ক্ষমা করা, সৎ কথা বলা, ওয়াদা পালন, আমানত আদায়, অল্পে তুষ্ট, অপরের কল্যাণ কামনা, অন্যের স্বার্থ অগ্রাধিকার দেওয়া), অসৎ গুণাবলি বর্জন (লোভ-লালসা, আত্মপ্রীতি, গর্ব-অহংকার, মিথ্যাচার, জাগতিক স্বার্থ চিন্তা, গিবত, পরনিন্দা, চোগলখুরি, রাগ ও অনর্থক কথা) করা।আত্মশুদ্ধি অর্জনের সবচেয়ে বড় সুযোগ তৈরি হয় পবিত্র রমজান মাসে। রমজানের গুরুত্ব ও ফজিলত উপলব্ধি ও পালনের মাধ্যমে আত্মার পবিত্রতা অর্জন ও ব্যক্তি গঠন সম্ভব। রোজা ছাড়া অন্য ইবাদত তাকওয়া সৃষ্টিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না।
ইসলামের মৌলিক ইবাদতগুলোর মধ্যে যেমন নামাজের মাধ্যমে মানুষকে দেখানোর সুযোগ রয়েছে, জাকাতের মাধ্যমে মানুষ দেখতে পায়, অন্তত যাকে যাকাত দেওয়া হলো সে তো জানতে পারে। হজ পালনে মানুষ বুঝতে পারে।
কিন্তু রোজা যদি কেউ একান্তে গোপনে ঘরে নিভৃত কোণে বসে পানাহার করে তা কোনো মানুষ দেখতে পায় না, সে ক্ষেত্রে শুধু আল্লাহভীতির গুণাবলিই লোকচক্ষুর অন্তরালে ব্যক্তিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত রাখতে পারে। আর তাকওয়ার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি শুধু রমজান মাসের জন্য নয় বরং তার জীবন গঠনে যাবতীয় অন্যায়, দুর্নীতি, পাপ, খারাপ কাজ থেকে লোক ভয় নয়, আল্লাহর ভয়ে বিরত থাকার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির পথ সুগম করে দেয়।
