মৃত্যু থেকে পুলসিরাত বা দুনিয়ায় পরের জীবন

মৃত্যু, কবর ও হাশর | দুনিয়ায় পরের জীবন

মৃত্যু, কবর ও হাশর | দুনিয়ায় পরের জীবন
 
মৃত্যু:

যার ভয়াবহতাই জাহান্নামীদের জন্য যথেষ্ঠ। উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) বলেন, "যিনি ছাড়া কোনো রব নেই সেই আল্লাহর কসম, যদি আমার কাছে দুনিয়ার সকল স্বর্ণ এবং রৌপ্য থাকতো, আমি সেগুলোর বিনিময়ে হলেও মৃত্যুর পরে যে ভয়াবহতা রয়েছে তা থেকে বাঁচার চেষ্টা করতাম।" [সাহীহ আত-তাওতিক ফি সীরাত ওয়া হায়াত আল-ফারুক, পৃ ৩৮৩]

কবর:

মৃত্যুর ভয়াবহতা শেষ না হতেই শুরু হয়ে যাবে কবরের নিঃসঙ্গতা ও ভয়ানক দুর্দশাগ্রস্থ জীবন। আপনার সাথে কেউ নেই, একা। কি দিন, কি রাত! সেখানে কেবল যন্ত্রনা আর যন্ত্রনা। রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন- "আমি কবরের দৃশ্য থেকে অধিক ভয়ানক দৃশ্য কখনো দেখিনি।" [তিরমিযী/২৩০৮ (হাসান)]

কিয়ামত ও হাশর

কবরের যন্ত্রণাময় জীবন শেষ হবে শিংগার বিকট শব্দে। রূহসমূহ মৌমাছির মতো বের হয়ে আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী স্থান পূর্ণ করে দেবে। অতঃপর রূহসমূহ দেহে প্রবেশ করবে। কিয়ামত! মহান আল্লাহ বলেন:

"শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে, ফলে আসমান ও যমীনে যারা আছে সবাই বেহুঁশ হয়ে যাবে, তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন। অতঃপর আবার শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে, তৎক্ষণাৎ তারা দন্ডায়মান হয়ে দেখতে থাকবে।" [৩৯:৬৮]

অতঃপর হিসাবের জন্য হাশরের মাঠে অপমান আর লাঞ্চনার অপেক্ষা। "ইয়াওমুদ্দিন"- এ অপরাধীদের দাড়ানোর কোনো জায়গা থাকবে না। উপুড় মুখে… আপনি চিন্তা করতে পারেন!

"… আর আমি কিয়ামতের দিনে তাদেরকে একত্র করব উপুড় করে, অন্ধ, মূক ও বধির অবস্থায়। তাদের আশ্রয়স্থল জাহান্নাম; যখনই তা নিস্তেজ হবে তখনই আমি তাদের জন্য আগুন বাড়িয়ে দেব।" [১৭:৯৭]

এই ভীতিকর ও ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পাপাচারী, জালেম, মুনাফিকদের দেখা যাবে অবনত মস্তকে, অপলক নেত্রে। আর তাদের অন্তর থাকবে শূন্য। সেদিন আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কেউ কোনো কথা বলতে পারবে না। সেদিন মানুষের হৃদয় থাকবে ওষ্ঠাগত, বিষন্ন। কিয়ামতের সে দিনটির দৈর্ঘ হবে পঞ্চাশ হাজার বছর। মহান আল্লাহ বলেন:

মিযান ও পুলসিরাত 

অতঃপর মহান আল্লাহ ন্যায়বিচারের মানদণ্ড স্থাপন করবেন। ছোট বড় কিছুই সেদিন বাদ যাবে না। মহান আল্লাহ বলেন:

"আমি কেয়ামতের দিন ন্যায়বিচারের মানদন্ড স্থাপন করব। সুতরাং কারও প্রতি জুলুম হবে না। যদি কোন আমল সরিষার দানা পরিমাণও হয়, আমি তা উপস্থিত করব এবং হিসাব গ্রহণের জন্যে আমিই যথেষ্ট।" [২১:৪৭]

রসুলুল্লাহ (স) বলেন, "তোমাদের প্রত্যেক ব্যক্তির সাথে আল্লাহ তাআলা সরাসরি কথা বলবেন, মাঝখানে কোনো দোভাষী থাকবে না। তখন সে তার ডান দিকে তাকাবে এবং সেখানে সে তার কৃত আমল ছাড়া আর কিছুই দেখবে না। সে বাম দিকে তাকাবে, সেখানেও সে তার কৃত আমল ছাড়া অন্যকিছু দেখবে না। সে তার সামনের দিকে তাকাবে এবং আগুন ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাবে না। সুতরাং আগুন থেকে বাচোঁ, যদিও শুকনো খেজুরের এক টুকরো অথবা একটি ভালো কথা ব্যয় করে হয়।" [মুসলিম/১০১৬]

"আর আমলনামা সামনে রাখা হবে। তাতে যা আছে; তার কারণে আপনি অপরাধীদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত দেখবেন। তারা বলবে: হায় আফসোস, এ কেমন আমলনামা। এ যে ছোট বড় কোনো কিছুই বাদ দেয়নি-সবই এতে রয়েছে। তারা তাদের কৃতকর্মকে সামনে উপস্থিত পাবে। আপনার পালনকর্তা কারও প্রতি জুলুম করবেন না।" [১৮:৪৯]

হিসাবের পর আপনাকে মুখোমুখি করা হবে পুলসিরাতের। পুলসিরাতের উপর দিয়ে সকলকেই অতিক্রম করতে হবে। নেককার বিদ্যুৎ, বাতাস ও দ্রুতগামী ঘোড়ার গতিতে তা পার হয়ে যাবে। কেউ পার হবে সম্পূর্ণ নিরাপদভাবে। কেউ সামান্য আঁচড় খেয়ে। কেউ আহত হয়ে। আর কেউ হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাবে জাহান্নামে। এমনকি সর্বশেষ ব্যক্তিকে টেনে টেনে নেয়া হবে। সাহাবী আবু সাঈদ রাযি. বলেন, "পুলসিরাত হবে চুলের চেয়েও চিকন, তরবারির চেয়েও ধারালো।"

"যার আমলনামা তার বাম হাতে দেয়া হবে সে বলবে, 'হায়, আমাকে যদি আমার আমলনামা দেয়া না হত'! 'আর যদি আমি না জানতাম আমার হিসাব'! 'হায়, মৃত্যুই যদি আমার চূড়ান্ত ফয়সালা হত'! 'আমার সম্পদ আমার কোন কাজেই আসল না!' আমার ক্ষমতাও আমার থেকে চলে গেল! (বলা হবে) 'তাকে ধর অতঃপর তাকে বেড়ি পরিয়ে দাও। তারপর তাকে তোমরা নিক্ষেপ কর জাহান্নামে'।" [৬৯:২৫-৩১]