ঈমান কাকে বলে?
ঈমান আরবী শব্দ, অর্থ হচ্ছে মুখে স্বীকৃতি ও অন্তরে বিশ্বাস বাস্তবে তার প্রতিফলন। অর্থাৎ মহান আল্লাহ তা'আলার যাবতীয় আদেশ এবং নিষেধসমূহের উপর ও আল্লাহর প্রেরিত নবী, রাসূল, ফেরেশতা, আখেরাত ইত্যাদির উপর বিশ্বাস রেখে কাজে পরিণত করাকে ঈমান বলে। ঈমান ছাড়া মুসলমান হওয়া যায় না । কালেমা ইমানের মুল ভিত্তি:
কালেমায়ে তাইয়্যেবা
লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।
কালেমায়ে শাহাদাত
আশহাদু আল্লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু ।
কালেমায়ে তাওহীদ
লা-ইলা-হা ইল্লাআন্তা ওয়াহিদাল্লা-ছা নিয়ালাকা মুহাম্মদুর রাসূলুল্ল-হি-ইমা-মুল্ মুত্তাক্বী- না রাসূলু রাব্বিল আ-লামী-না। কালেমায়ে তামজীদ-
ঈমানে মুজমাল
বাংলা উচ্চারণ : আ-মানতু বিল্লা-হি কামাহুয়া-বিআসমা-ইহী ওয়া ছিফা-তিহী ওয়া কাবিলতু জামী আ আকা-মিহী ওয়া আরকা-নিহী । অনুবাদ ঃ আমি ঈমান আনলাম আল্লাহর প্রতি ও তাঁর নামসমূহ ও গুণাবলীর প্রতি এবং তাঁর সকল প্রকার নির্দেশাবলী ও বিধানসমূহ মেনে নিলাম ।
ঈমানে মুফাচ্ছাল
বাংলা উচ্চারণ : আ-মানতু বিল্লা-হি ওয়া মালা--য়িকাতিহী ওয়া কুতুবিহী ওয়া রুসুলিহী ওয়াল ইয়াওমিল আ-খিরি ওয়াল কাদরি খাইরিহী ওয়া শাররিহী মিনাল্লা-হি তা'আলা ওয়াল বা'ছি বা'দাল মাউত ।
![]() |
ইমান ও আমল, ইসলামের প্রথম খুটি |
অনুবাদ : আমি ঈমান আনয়ন করলাম মহান আল্লাহ তা'আলার উপর, তাঁর ফেরেশতাদের উপর, তার কিতাবসমূহের উপর এবং তাঁর রাসূলগণের উপর ও পরকালের মহাবিচার দিনের উপর এবং তাক্বদীরের ভাল এবং মন্দ একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত হওয়ার উপর।
আল্লাহর প্রতি ঈমান
আল্লাহ সম্পর্কে তিনি নিজেই পবিত্র কালামে এরশাদ করেছেন- "তিনিই আল্লাহ, যিনি ব্যতীত অন্য কেউ মা'বুদ (উপাস্য) নেই। তিনি জীবন্তও প্রতিষ্ঠিত, তাঁকে তন্দ্রা ও নিদ্রা স্পর্শ করতে পারে না। আসমান ও যমীনের মধ্যে যা কিছু আছে, সমস্তই তাঁর জন্য। কে এমন আছে যে, তাঁর নির্দেশ ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করতে পারে ? তিনি অগ্র-পশ্চাতের সমস্তকিছু জানেন। আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত তাঁর ইলমের সামান্যতম অংশও কেউ আয়ত্ব করতে সক্ষম নয়। তাঁর (জ্ঞানের) সিংহাসন সমস্ত আসমান-যমীন ব্যাপি পরিব্যাপ্ত। তাদের রক্ষণাবেক্ষণ করতে তাঁর একটুও বেগ পেতে হয় না। তিনি বিরাট ও মহান।”
-(সূরা বাকারা আয়াত : ২৫৫)
মহান প্রতিপালক আল্লাহ তা'আলা সমস্ত প্রাণী জগতের হায়াত ও মৃত্যু দানকারী ও পানাহার প্রদানকারী। তিনি আইন-কানুন ও বিধি-বিধান দাতা। জিন ও ইনসান যা কিছু করে ও বলে থাকে এবং যা কিছু অন্তরে গোপন করে রাখে, তিনি সমস্তই জানেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বি কেউ নেই। তাঁর ইচ্ছার প্রতিবাদ বা মুকাবিলা করার সাহস বা শক্তি কারো নেই। এ সকল মহান গুণাবলীর অধিকারী একমাত্র আল্লাহ তা'আলা, তিনি ব্যতীত অন্য কেউ এবাদতের যোগ্য নেই। তিনিই সবকিছুর প্রতিপালক ও এবাদতের মালিক। তিনি চিরস্থায়ী, তাঁর গুণাবলীও চিরস্থায়ী, অনন্তকালব্যাপী আছেন ও থাকবেন। তাঁর কোন শরীক নেই, তিনি অদ্বিতীয়। তিনি নিরাকার ও নিরাহার, তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন, বরং জগতবাসী তাঁর মুখাপেক্ষী।
তিনি দাতা, দয়ালু, ধৈর্য্যশীল ও ক্ষমাশালী । আল্লাহর কোন বান্দা অন্যায় করলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে শাস্তি দেন না বরং বান্দা ক্ষমা ভিক্ষা চাইলে তিনি তাকে ক্ষমা করে দেন। অতএব, মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান স্থাপন করা প্রত্যক মানুষের জন্য ফরয। আল্লাহর প্রতি ঈমানের তাৎপর্য হল, আল্লাহ তা'আলার জাত-সত্ত্বা ও তাঁর সমস্ত ছেফাতী নামসমূহের এবং গুণাবলীর প্রতি জবানের স্বীকৃতিসহ অন্তরে সাথে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস স্থাপন করা যে, আল্লাহ তা'আলাই একমাত্র উপাস্য অর্থাৎ এবাদতের যোগ্য। অতঃপর তাঁর বিধানমত আমল করা।
অর্থাৎ কালেমা তাইয়্যেবা মুখে পাঠ করা, তা অন্তরে বিশ্বাস করা এবং আমলের দ্বারা কার্যে পরিণত করা। একেই আল্লাহর প্রতি ঈমান বলা হয়।
ফেরেশতাদের উপর ঈমান
আল্লাহর সৃষ্ট ফেরেশতাদের উপর ঈমান আনা বা বিশ্বাস স্থাপন করা ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ফেরেশতাদেরকে আল্লাহ পাক স্বীয় আজ্ঞাবহ হিসাবে নূর দ্বারা পয়দা করেছেন। আমরা যদিও তাদেরকে দেখতে পাই না, তথাপি তাদের প্রতি ঈমান রাখতে হবে। তাদেরকে অবিশ্বাস করা আল্লাহ তা'আলাকে অবিশ্বাস করার তুল্য ।
কিতাবসমূহের উপর ঈমান
মহান পালনকর্তা আল্লাহ তা'আলা যুগে যুগে তাঁর প্রেরিত নবী- রাসূলদের নিকট ফেরেশতাদের মাধ্যমে জিন ও ইনসানের হেদায়াতের জন্য তাঁর অনুমোদিত পথে জীবন নির্বাহের জন্য যে সকল হুকুম-আহকাম পাঠিয়েছেন তাকেই আসমানী কিতাব বলা হয়।
আল্লাহ পাক যুগে যুগে নবীদের প্রতি মোট একশত চারখানা কিতাব নাজিল করেছেন। এগুলোর মধ্যে চারখানা কিতাব প্রধান,
যথা : (১) যাবুর, (২) তওরাত, (৩) ইঞ্জিল ও (৪) ফোরকান বা কোরআন ।
নবী-রাসূলদের উপর ঈমান
নবী শব্দের অর্থ, সংবাদ দাতা। আর ইসলামী শরীয়াতের পরিভাষায়, আল্লাহ পাক তাঁর বান্দাদের হেদায়াতের জন্য সর্বপ্রকার গুণে গুণান্বিত করে সৎ সভাব ও সৎ চরিত্রে অলঙ্কৃত করে যাবতীয় জ্ঞান বুদ্ধিতে পরিপূর্ণ করে 'অহী' প্রেরণ করতঃ জিন ও মানব জাতীর পথ প্রদর্শনের জন্য যাঁদেরকে মনোনীত করেছেন বা প্রেরণ করেছেন, তাদেরকেই নবী বলা হয় । নবী শব্দের বহুবচন হল আম্বিয়া । নবীদের সংখ্যা নিয়া মতভেদ আছে, কারো মতে এক লক্ষ চব্বিশ হাজার, আবার কারো মতে দু লক্ষ চব্বিশ হাজার। এ নবীদের মধ্যে যাঁদের নিকট আল্লাহ্ তা'আলা অহীর মাধ্যমে কিতাব প্রেরণ করেছেন। তাঁরা হচ্ছেন রাসূল । সকল নবী-রাসূলদের প্রতি ঈমান রাখা ফরয।
আখেরাত বা পরকালের উপর ঈমান
আখেরাত বা পরকালের প্রতি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস স্থাপন করা ঈমানের একটি অন্যতম প্রধান অঙ্গ। দুনিয়ায় মানুষের সুখ-দুঃখের সীমা আছে এবং শেষও আছে কিন্তু পরকালে অর্থাৎ আখেরাতে সুখ-শান্তি ও দুঃখ-কষ্টের কোন সীমা নেই। পরকালে হাশর ময়দানে শেষ বিচারের পরে যারা বেহেশতে প্রবেশ করবে তারা তথায় অনন্তকাল সীমাহীন সুখ-শান্তি ভোগ করতে থাকবে। আর যে সমস্ত কাফের বেঈমান শেষ বিচারের পরে দোযখে নিক্ষিপ্ত হবে, তারা তথায় চিরদিন কঠোর আজাব ভোগ করতে থাকবে। দুনিয়াবী জিন্দেগী অস্থায়ী আর আখেরাতের জিন্দেগী চিরস্থায়ী। এ নশ্বর দুনিয়া হচ্ছে পান্থশালা, এটা আখেরাতের কৃষিক্ষেত্র। ইহকাল হচ্ছে নেকী কামাইয়ের কর্মস্থল, সঞ্চয়ের স্থান। আর পরকাল হচ্ছে ভোগ করার স্থান ।
তাক্বদীরের উপর ঈমান
হাদীছ শরীফে আছে, হযরত ইবনে ওমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (ছঃ) বলেছেন—আমার উম্মাতের মধ্য হতে যারা তাক্বদীরের প্রতি বিশ্বাস করে না, তারা অগ্নিপূজক সমতুল্য ; এ শ্রেণীর মানুষেরা রোগাক্রান্ত হলে। তোমরা তাদেরকে দেখতে যাবে না। এরা মৃত্যুবরণ করলে তোমরা তাদের জানাযায় শরীক হবেনা। - (মেশকাত)
ইমানদারগণ তাকওয়ার মধ্যে থাকেন।
অর্থাৎ তাকওয়া (আরবি: تقوى) শব্দের অর্থ বিরত থাকা, বেঁচে থাকা, নিষ্কৃতি লাভ করা, ভয় করা, নিজেকে রক্ষা করা। ব্যবহারিক অর্থে দ্বীনদারি, ধার্মিকতা, পরহেজগারি, আল্লাহভীতি, খোদাভীতি, আত্মশুদ্ধি , আল্লাহ ও সত্যের প্রতি সচেতন এবং পরিজ্ঞাত হওয়া, "ধর্মপরায়ণতা, আল্লাহর ভয়" ইত্যাদি বোঝায়।
