তাহাজ্জুদ ও অন্যান্য ওয়াজিব, নফল নামাজগুলো কি কি?

সালাতুয্ যুহা বা চাশত নামায

'যুহা' শব্দের অর্থ সূর্যের ঔজ্জ্বল্য। এই নামায প্রথম প্রহরের পর হতে দ্বিপ্রহরের পূর্বেই আদায় করা হয় বলে একে 'সালাতুস্ মুহা' বলা হয়। ফার্সীতে এ নামাযের নাম চাশতের নামায ।

আল্লাহ প্রেমিকদের নামাযের সময় হল যখন উট-শাবকের পায়ে উত্তাপ লাগে (অর্থাৎ মাটি গরম হয়ে যায়, উক্ত সময়ের নামায হল চাত নামায) ।[ মুসলিম/১৬১৭] © চাশতের নামায ২, ৪, ৬, ৮ রাক'আত পর্যন্ত আদায় করা যায়। বুখারী/১১০১, মুসলিম/১৫৪১]

যে ব্যক্তি চাশতের দু' রাক'আত নামায প্রতিদিন আদায় করবে সমুদ্রের ফেনার মতও যদি তার পাপ হয় তা ক্ষমা করে দেয়া হবে। [তিরমিযী / ৪৭৬, ইবন মাজাহ/১৩৮২]

তাহাজ্জুদ ও অন্যান্য নামাজ
তাহাজ্জুদ ও অন্যান্য নামাজ 

তাহাজ্জুদ নামায

আল্লাহ বলেন :

রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ কায়েম করবে, এটা তোমার জন্য এক অতিরিক্ত কর্তব্য। আশা করা যায়, তোমার রাব্ব তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থানে। [সূরা ইসরা-৭৯/]

  • ফরয নামাযের পর সবচেয়ে ফাযীলাতের নামায হল রাতের (তাহাজ্জুদ) নামায। [মুসলিম/২৬২২, তিরমিযী /৪৩৮, নাসাঈ /১৬১৬]

রাসূল (সাঃ) তাহাজ্জুদ নামাযের জন্য নিদ্রা থেকে জেগে যে দু'আ পাঠ করতেন : 

  • “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া 'আলা কুল্লি সাইয়িন কাদীর, 
  • আল হামদুলিল্লাহি, ওয়া সুবহানাল্লাহি, ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, ওয়া লা হাওলা ওয়া লা কৃওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ। 
  • অতঃপর বলেছেন: কেহ যদি অন্য যে কোন বিষয়ে দু'আ করে, তার দু'আ কবুল করা হয়। এরপর উযূ করে নামায আদায় করলে তার নামায কবুল করা হয়। [বুখারী/১০৮২)]
  • রাসূল (সাঃ) রাতের প্রথমাংশে ঘুমাতেন, শেষাংশে জেগে নামায আদায় করতেন। (বুখারী/১০৭৫, মুসলিম / ১৫৯৮, ইবন মাজাহ/১৩৬৫] 
  • রাসূল (সাঃ) রামাযান মাসে এবং রামাযান মাস ছাড়া অন্য মাসেও রাতে এগার রাক'আতের অধিক নামায আদায় করতেননা। [মুসলিম/১৫৯৩, বুখারী/১০৭৬]
  • রাতে তাহাজ্জুদ নামায ১১ রাক'আত : দুই দুই করে ৮ রাক'আত তাহাজ্জুদ। অতঃপর ৩ রাক'আত বিতর। [বুখারী/১০৬৮, মুসলিম/১৫৯৩, নাসাঈ / ১৭১০]
  • অথবা দুই দুই রাক'আত করে ৬ রাক'আত তাহাজ্জুদ। অতঃপর ৫ রাক'আত বিতর। [আবু দাউদ/১৩৫৯] অথবা দুই দুই রাক'আত করে মোট ১০ রাক'আত তাহাজ্জুদ। অতঃপর ১রাক'আত বিতর। [মুসলিম/ ১৫৮৭, তিরমিযী / ৪৪০]
  • রাতে তাহাজ্জুদ নামায ৯ রাক'আতও আদায় করা যায় : দুই দুই রাক'আত করে ৬ রাক'আত তাহাজ্জুদ। অতঃপর ৩ রাক'আত বিতর।[বুখারী/১০৬৮]
  • অথবা দুই দুই রাক'আত করে ৮ রাক'আত তাহাজ্জুদ। অতঃপর ১ রাক'আত বিতর। [মুসলিম/১৫৬৯, তিরমিযী / 888 
  • রাতে তাহাজ্জুদ নামায ৭ রাক'আতও আদায় করা যায়। দুই দুই রাক'আত করে ৬ রাক'আত তাহাজ্জুদ। অতঃপর ১ রাক'আত বিতর। অথবা দুই দুই রাক'আত করে ৪ রাক'আত তাহাজ্জুদ। অতঃপর ৩ রাক'আত বির। (বুখারী/১০৬৮, আবূ দাউদ/১৩62)
  • রাসূল (সাঃ) যখন নিদ্রা, অসুখ-বিসুখ কিংবা ব্যথা-বেদনার কারণে রাতে তাহাজ্জুদ নামায আদায় করতে পারতেননা, তখন তিনি দিনের বেলা ফাজর ও যুহরের নামাযের মাঝে বার রাক'আত নামায আদায় করে নিতেন। [মুসলিম/১৬১৫, তিরমিযী/৫৮১, নাসাঈ / ১৭৯২]


বিতর নামায

বিতর অর্থ বেজোড়। ইশা, তারাবীহ, তাহাজ্জুদ নামায শেষে বিতর নামায আদায় করতে হয়।

রাতের প্রথম অংশে, মাঝরাতে এবং শেষ রাতে বিতর নামায আদায় করা যায়। (বুখারী/৯৩৭, মুসলিম / ১৬০৭)বি

বিতর নামায ১, ৩, ৫, ৭ কিংবা ৯ রাক'আত পর্যন্ত আদায় করা যায়। [বুখারী/৪৫৯, ৯৩৪, মুসলিম/ ১৫৯০, ১৬০৯, ১৬১৯, ইবন মাজাহ / ১১৭৪, ১১৯০, নাসাঈ/১৬৯২, ১৭১৩, ১৭২০, ১৭২১]

বিতর নামায ১ রাক'আত আদায়ের নিয়ম : প্রথমে তাকবীর দিয়ে বুকে হাত বেঁধে সানা, সূরা ফাতিহা, অন্য একটি সূরা এবং দু'আ কুনূত (রুকুর পূর্বে বা পরে দাঁড়িয়ে) পাঠ করতে হয়। তারপর সাজদা করে বসতে হবে। অতঃপর আত্তাহিয়্যাত্ব, দুরূদ ও অন্যান্য দু'আ পড়ে সালাম ফিরাতে হবে। [বুখারী/১০৬৬, মুসলিম/ ১৬১৯/

বিতর নামায ৩, ৫ কিংবা ৭ রাক'আত আদায় করতে চাইলে একটানা আদায় করে শুধু শেষ রাক'আতের পর বৈঠক করতে হয় এবং আত্তাহিয়্যাতু, দুরূদ ও অন্যান্য দু'আ পড়ে সালাম ফিরাতে হবে। [মুসলিম/১৫৯০, নাসাঈ/১৭২১]

***রাসূল (সাঃ) তিন রাকাআত বিতর নামায মাগরিবের নামাযের মত আদায় করতে নিষেধ করেছেন। অর্থাৎ ২য় রাক'আতে বৈঠক না করে একটানা ৩ রাক'আত আদায় করতে হবে। [দারাকুতনী, নাইলুল আওতার, বাইহাকী-৩/৪১]

বিতর নামাযের শেষ রাকাআতে রুকুর আগে কিংবা রুকুর পর দাঁড়িয়ে দু'আ কুনুত পাঠ করতে হয়। [বুখারী/৯৪২, ইবন মাজাহ/১১৮৩) (বির নামাযে হাদীস অনুযায়ী শেষ রাক'আতে রুকুর পূর্বে সূরা ফাতিহা, অন্য সূরা এবং দু'আ কুনূত এক সঙ্গে পাঠ করতে হয়। অথবা রুকুর পর দাঁড়িয়ে মুনাজাতের ন্যায় হাত তুলে দু'আ কুনূত পাঠ করতে হয়। কিন্তু দেখা যায় ২৮

***কেহ কেহ শেষ রাক'আতে সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা পাঠ করার পর তাকবীর তাহরীমার ন্যায় আবার তাকবীর দিয়ে হাত বুকে বেঁধে দু'আ কুনূত পাঠ করে, এরূপ নিয়ম সহীহ হাদীসে পাওয়া যায়না)

বিতর নামাযে এই দু'আ কুনূত পাঠ করা যায় আল্লাহুম্মাহসিনী সীমান হাদাইতা ওয়া 'আফিনী ফিমান' 'আফাইতা ওয়া তাওয়াল্লানী কী মান তাওয়াল্লাইতা ওয়া বারিক লী ফীমা আ'ভাইতা ওয়া কিনী শাররা মা কাযাইতা, ফা ইন্নাকা তাকফী ওয়ালা ইউক্যা আলাইকা ওয়া ইন্নাহু লা ইয়াযিললু মাওঁ ওয়ালাইতা ওয়ালা ইয়া'য়িষ্ণু মান্ 'আদাইতা, তাবারাকৃতা রাব্বানা ওয়া তা'আলাইতা ওয়া নাস্তাগফিরুকা ওয়া নাতুবু ইলাইকা, ওয়া সাল্লালাহু 'আলান নারী। মাজাহ/১১৭৮] [আবু দাউদ/১৪২৫, তিরমিযী/৪৬৪, ইবন

(এ ছাড়া সহীহ হাদীসে বর্ণিত অন্যান্য দু'আ কুনূতও পাঠ করা যায়)

 

ঈদের নামায

ঈদুল ফিতর ঈদুল আযহার নামায দুই রাক'আত। আযান ও ইকামাত ছাড়াই ঈদের নামায আদায় করতে হয়। [বুখারী/৯০৫, ১০৮, নাসাঈ/১৫৬৫, ১৫৬৯, ইবন মাজাহ/১২৭৪

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) দুই ঈদের নামাযের প্রথম রাক'আতের (তাকবীরে তাহরীমা ও ছানা পাঠের পরে) কিরাআতের পূর্বে সাত তাকবীর এবং শেষ রাক'আতে, কিরা'আতের পূর্বে পাঁচ তাকবীর বলতেন। | ইন মাজাহ/১২৭৭, তিরমিযী /৫৩৬, আবু দাউদ/১১৫১)। রাসূল (সাঃ) ঈদের নামায ১২ (বার) তাকবীরে আদায় করেছেন। এ সম্পর্কে ১৫০টিরও অধিক হাদীস রয়েছে। প্রত্যেক তাকবীরের সময় ইমাম ও মুক্তাদীদেরকে দুই হাত কাঁধ কিংবা কান পর্যন্ত উত্তোলন করতে হবে।

রাসুল (সাঃ) বালিকা, তরুনী, গৃহিনী, যুবতী এবং ঋতুবর্তী সকল মহিলাদেরকেই ঈদের নামাযের উদ্দেশে ঈদগাহে যাবার জন্য বলেছেন । তবে ঋতুবতী মহিলারা নামাযের স্থান থেকে দূরে থাকবে এবং তারা শুধু অংশ গ্রহণ করবে। [বুখারী/৯২৩, তিরমিযী /৫৩৯) 

আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রাঃ) তাকবীর দিতেন 'আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার, আল্লাহ আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হাম্দ । (মুসান্নাফ ইব্‌ন আবী শাইবাহ, ইরওয়া ৩/১২৫]

 

জানাযার নামায

  • রাসূল (সাঃ) চার তাকবীরে জানাযার নামায আদায় করেছেন। [ইবন মাজাহ/১৫০৪, আৰু দাউদ/৩১৮২)
  • জানাযার নামাযে প্রত্যেক তাকবীরের সময় ইমাম ও মুক্তাদীদেরকে দুই হাত কাঁধ বা কান পর্যন্ত উত্তোলন করতে হবে। [ বুখারী/অনুচ্ছেদ-৪৮৭] 
  • জানাযার নামাযে প্রথম তাকবীরের পর ইমামকে সূরা ফাতিহা ও অন্য একটি সূরা পাঠ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে মুক্তাদীদেরকে শুধু সূরা ফাতিহা পাঠ করতে হবে। [বুখারী/১২৪৯, নাসাঈ / ১৯৯১, ইবন মাজাহ / ১৪৯৬, আবূ দাউদ/৩১৮৪)
  • (জানাযার নামাযে সানা পাঠ করার কথা সহীহ হাদীসে নেই।)
  • অতঃপর দুই হাত উঠিয়ে দ্বিতীয় তাকবীর দিতে হবে এবং নিম্নের দুরূদে ইবরাহীম পড়তে হবে আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিও ওয়া 'আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা নাইতা আলা ইবরাহীমা ওয়া 'আলা আলি ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিও ওয়া 'আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা বারাকতা 'আলা ইবরাহীমা ওয়া 'আলা আলি ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। [বুখারী/৫৯০৪, নাসাঈ/১২৯২]
  • তারপর দুই হাত উঠিয়ে তৃতীয় তাকবীর দিতে হবে এবং এই দু'আ পাঠ করতে হয় : আল্লাহুম্মাগফিরলি হাইয়িনা ওয়া মাইরিডিনা ওয়া শাহিদিনা ওয়া পায়িবিনা ওয়া ছাগীরিনা ওয়া কারীরিনা ওয়া যাকারিনা ওয়া উনুস্থানা, আল্লাহুম্মা মান আহইয়াইতাহু মিন্না ফাআয়িহী 'আলাল ইসলাম, ওয়া মান তাওয়াফফাইতাহু মিন্না ফাতাওয়াফফাহু 'আলাল ঈমান। আল্লাহুম্মা লা তাহরিমনা আজরাহু ওয়া লা তাতিন্না বা'দাহু। ইিবন মাজাহ/১৪৯৮, তিরমিযী/১০২৪] (এ ছাড়া সহীহ হাদীসে বর্ণিত অন্যান্য দু'আও পাঠ করা যায়)
  • অতঃপর দুই হাত উঠিয়ে চতুর্থ তাকবীর দিতে হবে এবং ডান ও বামদিকে সালাম ফিরাতে হবে। [নাসাঈ ১৯৯৩] 
  • শুধু ডান দিকে সালাম ফিরিয়েও জানাযার নামায শেষ করা যায়। [মুসান্নাফ ইবন আবী শা‍ইবাহ, ইরওয়া ৩/১৮১)

 

সাজদায়ে সাহু

  • সাহু আরবী শব্দ। এর অর্থ ভুল। অতএব সাজদায়ে সাহুর অর্থ হল ভুলের জন্য সাজদা।
  • সাজদায়ে সাহু সালাতে ভুলক্রমে কোন রুকন বা ওয়াজিব বাদ পড়লে যেমন রাক'আতের গণনায় ভুল হলে বা সন্দেহ হলে বা কম-বেশি হয়ে গেলে অথবা প্রথম বৈঠকে না বসে দাঁড়িয়ে গেলে ইত্যাদি কারণে এবং মুক্তাদিগণের মাধ্যমে ভুল সংশোধিত হলে সাজদায়ে সাহুর প্রয়োজন হয়। 
  • সাজদায়ে সাহুতে দু'টি সাজদা আছে। এ ক্ষেত্রে নামাযের শেষ বৈঠকে বসে আত্তাহিয়্যার, দুরুদ, দু'আয়ে মাসুরা ইত্যাদি পাঠ করার পর সালাম ফিরানোর পূর্বে 'আল্লাহু আকবার' বলে অন্যান্য সাজদার ন্যায় দু'টি সাজদা করতে হবে। সাজদায়ে সাহুর পরে তাশাহহুদ (অর্থাৎ আত্তাহিয়্যাতু, দুরূদ, দু'আ মাসুরা ইত্যাদি) পাঠ করতে হয়না। [বুখারী/১১৫১, বুখারী/অনুঃ ৪২৭]

·        

নামাযের পর হাত তুলে মুনাজাত করা

  • রাসূল (সাঃ) বৃষ্টি হওয়ার জন্য যে নামায তা ব্যতীত অন্য কোন নামাযে দু'আয় হাত উঠাননি। [বুখারী/৯৬৮, মুসলিম/১৯৪৬]
  • মুনাজাত নামাযের কোন অংশ নয়। রাসূল (সাঃ) ফরয নামাযে সালাম ফিরানোর পর দুই হাত তুলে মুনাজাত করেছেন বলে সহীহ হাদীসে কোন প্রমাণ পাওয়া যায়না