কুরবানীর প্রত্যেক সামর্থ্যবান ব্যক্তির কুরবানি করা ওয়াজিব। ইসলামি মতে কুরবানী হচ্ছে নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট ব্যক্তির আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পুরস্কার লাভের আশায় নির্দিষ্ট পশু জবেহ করা। হিজরী ক্যালেন্ডারের ১২ তম চন্দ্র মাসের জিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখ সকাল থেকে ১৩ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কুরবানী করার সময় হিসেবে নির্ধারিত। এই দিনে বিশ্ব জুড়ে মুসলমানরা কুরবানী দেয়। পবিত্র আল কোরআনের তিনটি স্থানে কুরবানির উল্লেখ আছে। যথাঃ
কুরআনে বর্ণিত - অতএব হে মানুষ! আল্লাহ-সচেতন হও। আল্লাহর ধর্মবিধান লঙ্ঘন হতে দূরে থাকো। জেনে রাখো, আল্লাহ মন্দ কাজের শাস্তিদানে কঠোর। (সূরা বাকারা, আয়াত ১৯৬)
হে নবী! কিতাবিগণকে আদমের দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের ঘটনা ভালো করে বর্ণনা করো। তারা যখন কোরবানি করেছিল, তখন একজনের কোরবানি কবুল হলো। কিন্তু অন্যজনের কোরবানি কবুল হলো না। ক্ষিপ্ত হয়ে সে বলল, আমি তোমাকে খুন করবো। অপরজন বলল, প্রভু তো শুধু আল্লাহ-সচেতনদের কোরবানিই কবুল করেন। (সূরা মায়েদা, আয়াত-২৭)
আল্লাহ বলেন, "বলো, আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও মৃত্যু সবকিছু আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জন্য।" (সুরা আনআম : ১৬২)
ইবরাহীম (আ.)-এর সেই কোরবানির ঘটনা আজ থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগের; আরবের মরুভূমিতে। হজরত ইবরাহীম (আ.) কে আল্লাহ স্বপ্নযোগে বললেন, ‘তোমার প্রিয়বস্তু আল্লাহর নামে কোরবানি করো।’ পরপর তিন দিন ইবরাহীম (আ.) এই স্বপ্ন দেখলেন এবং প্রতিদিন ১০০ করে মোট ৩০০ উট কোরবানি করলেন। পুনরায় স্বপ্নাদেশ হলো, ‘তোমার প্রিয়বস্তু কোরবানি করো।’ আল্লাহর খলিল বুঝতে পারলেন তাকে কোন বিষয়ের ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে। কালবিলম্ব না করে তিনি ইসমাইলকে তার স্বপ্নের বিবরণ জানালেন। কোরআনে এসেছে, ‘সে পুত্র যখন তার সাথে কাজকর্ম করার বয়সে পৌঁছল তখন ইবরাহীম তাকে বললেন, ‘হে পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখি তোমাকে আমি জবাই করছি, এখন তুমি বলো তুমি কী মনে করো?’ সে বলল, ‘হে আব্বাজান! আপনাকে যা হুকুম দেওয়া হচ্ছে তা করে ফেলুন, আপনি আমাকে ইনশাল্লাহ সবরকারীই পাবেন।’ (সুরা সফফাত : ১০২)
কুরআনে বর্ণিত- ইবরাহীম (আ.) বলতে পারতেন যে, হে আল্লাহ! তোমার জন্য আগুনে গিয়েছি, ঘরবাড়ি ছেড়েছি, আত্মীয়-স্বজন সব কিছু হারিয়েছি। এসব কিছুর বিনিময়ে আমার স্নেহের সন্তানকে কোরবানি করা থেকে রেহাই দাও। কিন্তু তিনি তা করেননি বরং আল্লাহ যা হুকুম করেছেন তা শর্তহীনভাবে মেনে নিয়েছেন। এবং তিনি আল্লাহর আনুগত্য পালনের ব্যাপারে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছেন। একজন মুসলিমের অন্যতম চাওয়া হলো আল্লাহর নৈকট্য অর্জন। পশুর রক্ত প্রবাহিত করার মাধ্যমে কোরবানিদাতা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করে।
আত্মত্যাগের এত উঁচু পর্যায়ের উপমা পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি ঘটেনি। এই মহান ত্যাগের নজির আল্লাহকে এত খুশি করে যে, তিনি কেয়ামত পর্যন্ত মানুষের জন্য কোরবানির বিধান প্রতিষ্ঠা করে দেন। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কোরবানির দিন রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে প্রিয় কোনো আমল আল্লাহর কাছে নেই।অতএব উপরের আলোচনা থেকে বলতে পারি যে, কোরবানি কি এবং কেন দেওয়া হয় এর আওতায় কোরবানির ইতিহাস সম্পর্কে জানতে সক্ষম হয়েছেন বা হবেন।
কোরবানির গুরুত্ব ও ফজিলত
ইসলামের অন্যতম বিধান হলো কোরবানি। কোরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। সামর্থ্যবান পুরুষ মহিলার ওপর কোরবানি ওয়াজিব।
কোরআন-সুন্নাহর আলোকে কোরবানির গুরুত্ব, ফজিলত ও সাওয়াব অনেক বেশি। কোরবানির মাধ্যমে গরিব-দুঃখী ও পাড়া-প্রতিবেশীর আপ্যায়নের ব্যবস্থা হয়। আল্লাহ ও তার রাসূলের শর্তহীন আনুগত্য, ত্যাগ ও বিসর্জনের শিক্ষাও আছে কোরবানিতে।
কুরআনে বর্ণিত- নবীজিকে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন- "আপনি আপনার রবের উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ুন এবং কোরবানি আদায় করুন। " (সুরা কাওসার:২)
অন্য আয়াতে এসেছে- "(হে রাসূল!) আপনি বলুন, আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ রাব্বুল আলামীনের জন্য উৎসর্গিত।" (সুরা আনআম : ১৬২)
কোরবানির পশুর মাংস সমান ৩ ভাগ করে...
- ১ ভাগ এতিম, মিস্কিনদের দিতে হয়
- ১ ভাগ আত্মীয়, প্রতিবেশীদের
- ১ ভাগ নিজেদের রাখার বিধান রয়েছে
কোরবানি কবুল না হওয়ার কারণ...
- লোক দেখানোর মনোভাব
- পশু কেনায় প্রতিদন্দিতা
- লোভ-হিংসা-অহংকার মনোভাব পোষণ
- আত্মিয়, গরীব ও প্রতিবেশী হক না দেয়া
- পশু কেনার টাকা হালাল না হওয়া
- কোরবানির পর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তথা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঠিকভাবে সম্পন্ন না করা।
কোরবানির পশু যেকোনো মুসলমান জবাই করতে পারেন। নিজের কোরবানির পশু নিজেই জবাই করা উত্তম। দোয়া জানা জরুরি নয়। নিজে জবাই করতে না পারলে যেকোনো কাউকে দিয়ে জবাই করাতে পারেন। জবাইয়ের সময় নিজে উপস্থিত থাকতে পারলে ভালো। একটি কোরবানি হলো একটি ভেড়া, ছাগল বা দুম্বা। গরু, মহিষ ও উট প্রতিটি ভেড়া, ছাগল ও দুম্বার সাতটির সমান। তাই গরু, মহিষ ও উটে অনূর্ধ্ব সাতটি পর্যন্ত অংশ দেওয়া যায়। আকিকা হলো একটি বা দুটি ছাগল। সুতরাং গরু, মহিষ বা উটে অংশ হয়ে যেভাবে কোরবানি দেওয়া যায়; সেভাবে একটিকে সাতটি ধরে অংশ হারে আকিকাও করা যায়। কোরবানি ও আকিকা একসঙ্গে করতে কোনো বাধা নেই। ওয়াজিব ও নফল কোরবানির গোশত খাওয়া যায় এবং খাওয়ানো যায়; এটি সবাই খেতে পারেন।
কুরবানি কবুল হওয়ার জন্য তাকওয়া তথা অন্তরের সুপ্ত বাসনাই হচ্ছে আসল। তাকওয়া অর্থ আত্মরক্ষা করা, নিষ্কৃতি লাভ করা, ভয় করা। অর্থাৎ আল্লাহর ভয় এবং তাঁর সন্তুষ্টি লাভের আশায় অপরাধ, অন্যায় ও আল্লাহর অপছন্দের কথা ও কাজ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার নাম তাকওয়া। অর্থাৎ আল্লাহর ভয়ে সব ধরনের অন্যায়, অত্যাচার ও পাপাচার বর্জন করে কোরআন ও সুন্নতের নিয়মানুযায়ী জীবন পরিচালনা করতে হবে, তাহলেই আল্লাহকে সন্তুষ্ট রাখা যাবে, সান্নিধ্য পাওয়া যাবে।
