হালাল ভাবে দুনিয়ার দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে আখিরাতের জন্য যথাযথ আমল করে তাকওয়ার সাথে ইমানদার হিসাবে পার করতে পারাই ইসলামের সফলতা।
ত্বাকওয়া' শব্দটির প্রকৃত অর্থ বেঁচে থাকা বা রক্ষা করা। ‘ত্বাকওয়া' শব্দটি বিশেষত রক্ষাকবচ অর্থে ব্যবহৃত হয়। সমস্ত অমঙ্গল, অনিষ্টতা ও অশালীন কর্ম থেকে সুরক্ষিত থাকাই হ'ল ‘ত্বাকওয়ার মূল লক্ষ্য। যে ব্যক্তি অন্যায়-অপকর্ম থেকে যতটা সুরক্ষিত তিনি ততটা আল্লাহভীরু। আর ত্বাকওয়াশীল ব্যক্তিই হবে বড় সফলকাম। এদের জন্যই তো আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, 'নিশ্চয়ই মুত্তাক্বীদের জন্য রয়েছে সফলতা' (নাবা ৭৮/৩১)।
![]() |
| ইসলামে সফলতা কি? |
ত্বাকওয়াই সফলতার অন্যতম উপায় এবং প্রধান নিয়ামক। বৈধ-অবৈধ পন্থার পরোয়া না করে অপরের হক গ্রাস ও যাবতীয় অর্থ-সম্পদ কুক্ষিগত করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মধ্যে সফলতা নেই, বরং তা নিহীত আছে অন্যায়-অপকর্ম থেকে বিরত থাকার মধ্যে। যদিও সমাজ তাকে ব্যর্থ বা বিফল ব্যক্তির দৃষ্টিতে দেখে। নবী করীম (ছাঃ) বলেন,
“আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের জন্য দরিদ্রতার ভয় করি না, বরং ভয় করছি যে দুনিয়াকে তোমাদের জন্য সম্প্রসারিত করে দেওয়া হবে, যা তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্য করা হয়েছিল। ফলে তোমরা তার জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে যাবে, যেমন তা পাওয়ার জন্য তারা করেছিল। আর তা তোমাদের ধ্বংস করবে, যেমন তাদেরকে ধ্বংস করেছিল'।[2]
প্রসঙ্গত নবী করীম (ছাঃ) বাহরাইনের অধিবাসীদের সাথে সন্ধি করেছিলেন এবং তাদের জন্য আলা-ইবনুল হাজরামীকে আমীর নিযুক্ত করেছিলেন। আবু ওবায়দা ইবনুল জাররাহ (রাঃ)-কে কর আদায়ের জন্য বাহরাইন পাঠিয়েছিলেন। তিনি করের মাল নিয়ে নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকটে উপস্থিত হ'লেন। ফজরের ছালাত শেষে আনছারগণ নবী করীম (ছাঃ)-এর সামনে উপস্থিত হ'লে তিনি তাদের দেখে একটু মুচকি হাসি দিয়ে বললেন, সুসংবাদ গ্রহণ করো, আশা রাখ যা তোমাদের খুশি করবে। এমন মুহূর্তে তিনি সম্পদ বণ্টন না করে আগে পূর্বোক্ত জাতির ধ্বংসের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে আনছারদের সামনে দুনিয়ার মোহ, মায়া ও প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা সম্পর্কে সম্যকভাবে সতর্ক করে দেন। যে আশঙ্কার কথা তিনি আমাদের ব্যাপারে প্রকাশ করেছিলেন বর্তমানে তা পদে পদে প্রতিফলিত হচেছ, দুনিয়ার সফলতাই যেন আমাদের শেষ কথা।
এজন্য আমরা কোন কিছুর তোয়াক্কা করি না। অর্থ সর্বস্ব দৃষ্টি দিয়েই আমরা সফলতার বিচার করি। একজন ব্যক্তির যাবতীয় ধর্মীয় গুণাবলী, উজ্জ্বল প্রতিভা, উন্নত চরিত্র সব ধরনের বৈশিষ্ট্য বর্তমান থাকার পরও আজকের সভ্য সমাজ তাকে মেয়ে দিতে ভয় পায়। শুধু চাকুরী পেয়ে প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার কারণে। সমাজের চোখে এমন ব্যর্থ বিফল হবার কারণে যারা দুনিয়ায় সাফল্য লাভের প্রতিযোগিতায় মগ্ন আখেরাত ভুলে আমরা তাদের হাতে সফলতার সার্টিফিকেট তুলে দেই। অথচ এমন কোন স্থান নেই, যেখানে নবী করীম (ছাঃ) আমাদের দুনিয়া সম্পর্কে সতর্ক করেননি।
আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, নিশ্চয়ই এই দুনিয়া সুমিষ্ট সবুজ বস্ত্ত। আল্লাহ তা'আলা তোমাদের এখানে প্রতিনিধি হিসাবে পাঠিয়েছেন, তোমরা কি কর্ম করছো তা প্রত্যক্ষ করার জন্য। অতএব তোমরা দুনিয়া থেকে বেঁচে থাক ও নারী থেকে দূরে থাক। কারণ বাণী ইসরাঈলদের মাঝে সর্বপ্রথম ফিতনার উদভব হয়েছিল নারীকে কেনদ্র করেই'।[3]
উক্ববা বিন আমের থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা নবী করীম (ছাঃ) বের হ'লেন এবং ওহোদের শহীদদের উপরে ছালাত আদায় করলেন। যেমন তিনি মৃতদের জন্য ছালাত আদায় করেন। অতঃপর তিনি মিম্বরে ফিরে গেলেন এবং বললেন, আমি তোমাদের অগ্রগামী, আমি তোমাদের জন্য সাক্ষী হব। আল্লাহর শপথ! আমি এখন আমার হাউজ (হাউজে কাওছার) দেখতে পাচিছ। আমাকে পৃথিবীর যাবতীয় ধনভান্ডারের চাবিকাঠি দেওয়া হয়েছিল। আল্লাহর শপথ! আমার মৃত্যুর পর তোমাদের জন্য আমি শিরকের ভয় করি না; বরং আমার আশঙ্কা হচেছ তোমরা পৃথিবী নিয়ে পরস্পর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে'।[4]
দুর্ভাগ্য যে, স্থায়ী সফলতার পথে যা প্রধান প্রতিবন্ধক তা অর্জনের জন্য আমরা অতি তৎপর। কোনভাবেই যেন আমরা দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত হ'তে পারছি না। ক্ষণিকের সুখ সমৃদ্ধির পেছনে ছুটতে গিয়ে আসল সফলতাকে নষ্ট করা কোন বিচক্ষণ ব্যক্তির কাজ হ'তে পারে না। আল্লাহ বলেন, এ নিশ্চয়ই পরকাল তোমার জন্য ইহকালের চাইতে কল্যাণকর' (যোহা ৯৩/৪)।
পার্থিব জগতে সফলতার লক্ষ্যে সম্পদের প্রতিযোগিতা মানুষকে যে পরকালীন সফলতার পথে অন্তরায় সৃষ্টি করেছে এ নিয়ে আমাদের মোটেও দ্বিধা নেই। সেজন্য মহান আল্লাহ বলেন, অধিক পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তোমাদেরকে (পরকাল থেকে) গাফেল রাখে, যতক্ষণ না তোমরা কবরস্থানে উপনীত হও (তাকাছুর ১০২/১-২)।
যারা পার্থিব যশ-অর্থ-খ্যাতি অর্জন করে সাফল্য পায়নি কিংবা প্রতিষ্ঠিত হ'তে পারেনি, তাদেরই দেখা যাবে ক্বিয়ামতের দিন দুনিয়ার নামী সফল ব্যক্তিদের তুলনায় অনেক আগেই জান্নাতের প্রবেশাধিকার অর্জন করেছে। নবী করীম (ছাঃ) বলেন, দরিদ্র মুসলিমগণ ধনীদের তুলনায় অর্ধ দিবস আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর তা হবে (দুনিয়ার দিন গণনা অনুযায়ী) পাঁচশত বছরের সমান।[5]
অন্যত্র নবী করীম (ছাঃ) বলেন, দরিদ্র মুহাজিরগণ তাদের ধনীদের তুলনায় পাঁচশত বছর আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে'।[6]
সম্পদের আধিক্য ও প্রাচুর্য মানুষকে মোহগ্রস্ত করে রেখেছে। সম্পদের সাথে সম্পৃক্ত মানুষের হক সংক্রান্ত বিষয়ে আমরা ভ্রূক্ষেপ করি না। একদিকে উপার্জিত সম্পদের উৎস যেমন পরিশুদ্ধ হ'তে হবে, অন্যদিকে সম্পদ ব্যয়ের খাত সমূহ তেমনি বিশুদ্ধ হ'তে হবে। সম্পদের সাথে সংযুক্ত হকসমূহ সঠিকভাবে আদায় না করলে ক্বিয়ামতের দিনে তা ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হ'তে পারে।
অর্থ সম্পদ ধোঁকা ও প্রতারণার বস্ত্ত। মানুষকে আল্লাহ বিমুখ করার অন্যতম হাতিয়ার। এজন্য ছহীহ মুসলিমের এই হাদীছটি আমাদের ইহলৌকিক জীবনে সুপথ দেখাতে পারে। আব্দুল্লাহ বিন ইয়াযীদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
তোমাদের প্রত্যেকের সাথে আল্লাহ কথা বলবেন, যেখানে উভয়ের মাঝে কোন অনুবাদক থাকবে না। সে তার ডানে দৃষ্টিপাত করবে, তখন পূর্বে প্রেরিত কর্ম ছাড়া সে আর কিছু দেখতে পাবে না। বামে দৃষ্টি নিক্ষেপ করবে, তখন তার প্রেরিত কর্ম ব্যতীত আর কিছু দেখতে পাবে না। তারপর সে তার সামনে দৃষ্টিপাত করবে, অতঃপর সম্মুখে জাহান্নামের আগুন ছাড়া অন্য কিছু দেখবে না। অতঃপর তোমরা জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচ, যদিও তা খেজুরের একটা অংশ দিয়েও হয়।[৪]
জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা পাওয়াটাই যে সবচেয়ে বড় সফলতা তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ভয়াবহ শাস্তির খেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য দুনিয়াতে আমরা যে যতটুকু প্রস্ত্ততি নিতে পেরেছি তিনি ততটাই সফলকাম। এ মর্মে হাদীছে এসেছে, আবু মালিক আল-আশ'আরী (রাঃ) হ'তে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন,
“পবিত্রতা ঈমানের একটি অবিচেছদ্য অংশ। আলহামদুলিল্লাহ (যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর) মীযানকে পরিপূর্ণ করে দেয়। আর সুবহানাল্লাহ, ওয়াল হামদুলিল্লাহ (আল্লাহর পবিত্রতা ও আল্লাহর প্রশংসা জ্ঞাপন) ভরপুর করে দেয়, অথবা আকাশ ও যমীনের মাঝে যা কিছু আছে তা পূর্ণ করে দেয়। ছালাত আলো, ছাদাক্বা (দান) প্রমাণ, ধৈর্য জ্যোতি, আর কুরআন তোমার পক্ষে অথবা তোমার বিপক্ষে দলীল। প্রতিটি ব্যক্তি প্রভাত করছে মুক্তির বিনিময়ে (জাহান্নামের আগুন থেকে) নিজেকে বিক্রি করে অথবা নিজেকে ধ্বংসে নিক্ষেপ করার বিনিময়ে'।[9] আল্লাহ বলেন,
জাহান্নামের অধিবাসী ও জান্নাতের অধিবাসী কখনো সমান নয় ৷ জান্নাতের অধিবাসীগণই সফলকাম' (হাশর ৫৯/২০)।
উপরোক্ত আলোচনার নিরিখে বিষয়টি স্পষ্ট যে, জাহান্নামের আগুন থেকে যিনি পরিত্রাণ পাবেন এবং জান্নাত লাভ করবেন তিনিই প্রকৃত সফলকাম ব্যক্তি। পৃথিবীর সফলতার পরিধিটা অনেকটা বিস্তৃত এবং পরিসরটাও অনেকটা বহুমুখী। দুনিয়ার সফলতার চাবি হাতে পেয়ে আত্মসুখে বিভোর হয়ে চূড়ান্ত ও মহা সফলতা থেকে যেন বিস্মৃত না হয়ে পড়ি। সেজন্য সর্বদা সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। আল্লাহ আমাদের সকলকে সেই ভয়ানক দিনের জন্য সর্বাত্মক প্রস্ত্ততি নেওয়ার তাওফীক দিন-আমীন!
[1]. তিরমিযী হা/২৩২৫; আহমাদ হা/১৮০৬০, সনদ হাসান।
[2]. বুখারী হা/৩৪৫৮; মুসলিম হা/২৯৬১; মিশকাত হা/৫১৬৩।
[3]. মুসলিম হা/২৭৪২; তিরমিযী হা/২১৯১; মিশকাত হা/৩০৮৬।
[4]. বুখারী হা/৬৪২৬; মুসলিম হা/২২৯৬।
[5]. তিরমিযী হা/২৩৫৪; ছহীহুল জামে' হা/৮০৭৬৷
[6]. তিরমিযী হা/২৩৫১; ছহীহুল জামে' হা/৪২২৮।
[7]. মুসলিম হা/২৮৭৯৷
[৪]. বুখারী হা/৭৫১২।
