![]() |
| লোভ-হিংসা-অহংকার |
- কাম
- ক্রোধ
- লোভ
- মোহ
- হিংসা
- অহংকার।
লোভ একটি নৈতিক ত্রুটি। লোভ-লালসা হলো অর্থসম্পদ, প্রাচুর্য বা ক্ষমতার প্রতি এক ধরনের দুর্বিনীত ক্ষুধা বা আকর্ষণ যা মানুষকে আত্মতৃপ্তি থেকে বঞ্চিত করে। লোভী মানুষ সারাজীবনের জন্য সন্তুষ্টি থেকে বঞ্চিত থাকে।
লোভী ব্যক্তির মনে অন্যের অর্থসম্পদ বা সম্মান অর্জিত হওয়া দেখলে অনুরূপ অর্থসম্পদ বা সম্মান অর্জনের জন্য অস্থির হয়ে ওঠেন এবং এগুলো অর্জনের জন্য বিভিন্ন ধরনের ছলচাতুরীর আশ্রয় নিতে কুণ্ঠিত হন না। এতে অন্যের লোকসান বা ক্ষয়ক্ষতি বিষয়টি তার মনে কোনোরকম রেখাপাত করে না। লোভ-লালসায় আচ্ছন্ন ব্যক্তি প্রায়ই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে থাকে। নিজের ভালো-মন্দ, নিজের লাভ বা প্রাপ্তি নিয়েই সারাক্ষণ নিয়োজিত থাকে। তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে বা অর্জন করতে এরা যতটুকু তৎপর থাকে পরিণাম নিয়ে ততটুকুই উদাসীন থাকে।
হিংসা কারীকে হিংসুক বলা হয়। হিংসুকের বৈশিষ্ট্য হ'ল সর্বদা 'হিংসাকৃত ব্যক্তির নে'মতের ধ্বংস কামনা করা'। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, 'দু'টি বস্ত্ত ভিন্ন অন্য কিছুতে হিংসা নেই। ১. আল্লাহ যাকে মাল দিয়েছেন। অতঃপর সে তা হক-এর পথে ব্যয় করে। ২. আল্লাহ যাকে প্রজ্ঞা দিয়েছেন, সে তা দ্বারা সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং শিক্ষা দেয়' (বুখারী হা/৭৩; মিশকাত হা/২০২)। এটিকে মূলত 'হিংসা' বলা হয় না, বরং 'ঈর্ষা' বলা হয়।
হিংসা নিষিদ্ধ এবং ঈর্ষা সিদ্ধ, বরং আকাংখিত। আসমানে প্রথম হিংসা করেছিল ইবলীস আদিপিতা আদম ও মা হাওয়ার সাথে। যমীনে প্রথম হিংসা করেছিল আদম পুত্র ক্বাবীল তার উত্তম ছোট ভাই হাবীলের সাথে। তাই ভাল-র প্রতি হিংসা চিরন্তন।
ইমাম রাযী বলেন, আল্লাহ মানুষের সকল নষ্টের মূল হিসাবে ‘হিংসা’ দিয়ে সূরা ফালাক্ব শেষ করেছেন। অতঃপর সকল অনিষ্টের মূল হিসাবে মানুষের মনে শয়তানের ‘খটকা’ সৃষ্টি বা ওয়াসওয়াসা দিয়ে সূরা নাস শেষ করেছেন’। যা তারতীবের দিক দিয়ে কুরআনের সর্বশেষ সূরা। এর মাধ্যমে মানুষকে মানুষের হিংসা থেকে ও শয়তানের খটকা থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর আশ্রয় চাইতে বলা হয়েছে। কেননা আল্লাহর রহমত ব্যতীত হিংসা ও শয়তানের খটকা থেকে বাঁচার কোন উপায় নেই। হুসাইন বিন ফযল বলেন, আল্লাহ এই সূরায় সকল মন্দকে একত্রিত করেছেন এবং ‘হিংসা’ দিয়ে সূরা শেষ করেছেন এটা বুঝানোর জন্য যে এটাই হ’ল সবচেয়ে নিকৃষ্ট স্বভাব’।
দম্ভ ও অহংকার মানুষকে জাহান্নামে নিয়ে যায় (যুমার ৩৯/৭২)। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা আমার আয়াত সমূহে মিথ্যারোপ করে এবং তা থেকে অহংকারবশে মুখ ফিরিয়ে থাকে, তাদের জন্য আকাশের দুয়ার সমূহ উন্মুক্ত করা হবে না এবং তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না ছুঁচের ছিদ্রপথে উষ্ট্র প্রবেশ করে। এভাবেই আমরা পাপীদের বদলা দিয়ে থাকি’ (আ‘রাফ ৭/৪০)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘ঐ ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না যার অন্তরে কণা পরিমাণ অহংকার রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘অহংকার’ হ’ল ‘সত্যকে দম্ভের সাথে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছ জ্ঞান করা’ (মুসলিম হা/৯১; মিশকাত হা/৫১০৮)। দুনিয়াতে অহংকারের পরিণতি হ’ল লাঞ্ছনা। আর আখেরাতে এর পরিণতি হ’ল ‘ত্বীনাতুল খাবাল’ অর্থাৎ জাহান্নামীদের উত্তপ্ত পুঁজ-রক্ত পান করা (তিরমিযী হা/২৪৯২)।
আল্লাহ মানুষকে মেধায়, শক্তিতে, সম্পদে ও মর্যাদায় পরস্পরে উঁচু-নীচু করেছেন কেবল তাদের পরীক্ষা করার জন্য এবং এগুলির মাধ্যমে পরকালীন পাথেয় সঞ্চয়ের জন্য। যারা এটা করেন, তারাই প্রকৃত অর্থে বিচক্ষণ ব্যক্তি (ইবনু মাজাহ হা/২৪৫৯)।
বর্তমান যুগে দেশে দেশে বর্ণবিদ্বেষ, অঞ্চল বিদ্বেষ, দলীয় বিদ্বেষ, ব্যক্তিবিদ্বেষ মানুষকে অন্ধ করে দিয়েছে। এমনকি পছন্দনীয় ব্যক্তি বা দলের বিপরীত কোন মুসলমানের মৃত্যুতে ইন্নালিল্লাহ...বলার স্বাধীনতাটুকুও হরণ করা হচ্ছে। অথচ মুখে সর্বদা গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ফেনা উঠছে।
রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কোন অঙ্গনই এ থেকে মুক্ত নয়। অথচ অহংকারের পতন যে অবশ্যম্ভাবী, তার বাস্তব প্রমাণ এদেশেই রয়েছে। আল্লাহ আমাদেরকে লোভ, হিংসা ও অহংকারের অনিষ্টকারিতা হ’তে রক্ষা করুন।-আমীন!
লোভ-হিংসা-অহংকার কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়?
১. রোজা রাখা। রোজাদার ব্যক্তির লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, মিথ্যা কথা, পরনিন্দা, অসৎ কাজ প্রভৃতি পাপাচার থেকে আত্মরক্ষা করা সহজ।
২. ধৈর্য ধারন করা।
৩. সহনশীলতা ও শান্ত থাকা।
৪. প্রয়োজনের অতিরিক্ত ত্যাগ করা।
৫. অতীত নিয়ে হতাশ না হওয়া।
৬. ভবিষ্যত ভেবে বিচলিত না হওয়া।
৭. রাগ নিয়ন্ত্রণ করা।
৮. আল্লাহর সকল ফয়সালা মেনে নেয়া।
৯. সর্বদাই সত্য বলা।
১০. পরিবার ও প্রতিবেশীকে সহযোগিতা করা।
