ইসলামের কু-সংস্কারের তালিকা।

দেশীয় ইসলামের কু-সংস্কারের তালিকা।
আবহমান কাল ধরে আমাদের এই উপমহাদেশের আরবী শিক্ষিত কতিপয় আলেম-ওলামা নামধারী ব্যক্তিরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থার যে ব্যাখ্যা দিয়ে এসেছেন, তা এক কথায় বড়ই জটিল এবং চরম কঠিনও বটে। ইসলামকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে খুবই কঠিন একটা ধর্ম হিসাবে। কঠিন বিধি নিষেধ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কঠিন ও রসকস বিহীন এক জীবন ব্যবস্থা হিসেবে তারা ইসলামকে ব্যাখ্যা করে এসেছেন। তাদের ব্যাখ্যা মানলে মুসলমানের জীবনে আরাম আয়েশ বলে কিছুই থাকে না। চোখের সামনে ভাসতে থাকে দাঁড়ি টুপিওয়ালা খটখটে কোন এক গুরুগম্ভীর মানুষ। 

অনুমিত হয়, হিন্দুধর্ম এবং অন্যান্য ধর্মের ছাঁচে তারা ইসলামকে টেনে এনেছেন নিজেদের অজান্তেই। সহজাতভাবে ভেবে নিয়েছেন, কঠোরতায় অনেক বেশী পূণ্য অর্জন করবেন। কঠোরতার জালে নিজেদের জড়াতে গিয়ে যুগে যুগে তারা ফরজের চাইতেও অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন নফল এবাদতের। নানা নফল এবাদতের বেড়াকলে নানা মনগড়া ব্যাখ্যায় মানুষকে কঠোর থেকে কঠোরতার দিকেই ঠেলে দিয়েছেন। 

ধর্মবেত্তারা সাধারণ মানুষজনের কাছে নফল এবাদতের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে করেই জীবন পার করে দিয়েছেন। সাথে পীর-দরবেশের নানা নফল মুস্তাহাবের রেফারেন্স তো আছেই, আছে তাদের কঠোর জীবন যাপনের চটকদার কাহিনীও। টুপি দাড়ি না হলে ধর্ম হবে না, ইংরেজদের মত প্যান্ট শার্ট পড়লে, বা ইংরেজী শিখলে মুসলমান থাকা যাবে না, ইত্যকার মনগড়া ফতোয়ায় তারা নিজেদের অজান্তেই ইসলাম ধর্মের বারটা বাজিয়েছেন। 

ধর্মবেত্তাদের এই কর্মযজ্ঞের ফলস্বরুপ এই উপমহাদেশের মানুষ টুপি পাওয়া না গেলে নামাজই পড়েন না। ফরজ নয়, কেবল নফল, সুন্নত, ওয়াজিব মোস্তাহাবের গুরুত্ব বর্ণনা্ করেই তারা ক্ষান্ত হয়েছেন। কোরআন নয়, দূর্বল আর জাল হাদীসগুলোকেও তিলকে তাল বানিয়ে সাধারণ মানুষের সামনে পেশ করেছেন। বেশীদিন আগের কথা নয়, প্যান্টশার্ট পরা থাকলে মসজিদে ঢোকা যেতো না। ফরজ নামাজ না পড়লেও, তারাবীর নামাজ তারা ঠিকই পড়েন। ফরজ নামাজ পড়েন না, কিন্তু শবে বরাতের রোজা, মহরমের রোজা. শাওয়াল মাসের রোজা ঠিকই রাখেন। 

কেউ কেউ আবার শির্ক মিশ্রিত এবাদতেও লিপ্ত হয়ে পড়েন। এসব মানসিকতায় সাধারণ মানুষের দোষ দেয়া যায় না। ধর্মবেত্তাদের যুগে যুগে কঠিন পরিশ্রমের (কু)ফল এটা। যার কারনে আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ জীবনের সব কাজ শেষ করে বৃদ্ধ বয়সে ধর্মকর্ম করবেন বলে নিয়ত করে থাকেন। অনেক যুবককেই বলতে শোনা যায়, এটা কি ধর্মকর্ম করার বয়স? ধর্ম কি এতো সহজ?

মানুষের ঈমান-আমল বিনষ্টকারী কুসংস্কার থেকে বেঁচে থাকা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব।

প্রচলিত এসব কুসংস্কার থেকে মানুষকে সতর্ক করতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত বিভিন্ন কুসংস্কারগুলো উল্লেখ করা হলো:
  • মাঝার, মসজিদে মানত করা।
  • অযু ছাড়া কোরান ধরা যাবেনা।
  • পায়ে ধরে সালাম করা।
  • সুন্নি, ওয়াহাবি ও শিয়া বিভেদ স্রিষ্টি।
  • পরীক্ষা দিতে যাওয়ার পূর্বে ডিম খাওয়া যাবে না। তাহলে পরীক্ষায় ডিম (গোল্লা) পাবে।
  • দোকানের প্রথম কাস্টমার ফেরত দিতে নাই।
  • জোড়া কলা খেলে জমজ সন্তান জন্ম নেয়।
  • রাতে নখ, চুল, দাঁড়ি-গোফ ইত্যাদি কাটতে নেই।
  • প্রথম সন্তান মারা গেলে পরের সন্তানের কান ফুটো করে দিতে হয়, তাতে সে দীর্ঘ হায়াত পায়।
  • ভাই-বোন মিলে মুরগি জবাই করা যায় না।
  • ঘর থেকে বের হওয়ার সময় পেছন থেকে ডাক দিলে তার যাত্রা অশুভ হয়।
  • ব্যাঙ ডাকলে বৃষ্টি হয়।
  • কোরআন শরীফ হাত থেকে পড়ে গেলে আড়াই কেজি চাল ‘সদকা’ করতে হয়, না হলে মাথার চুল উঠে যায়।
  • ছোট বাচ্চাদের দাঁত পড়লে তা ইঁদুরের গর্তে ফেলতে হয়, না হলে দাঁত আঁকাবাঁকা হয়।
  • মুরগির মাথা খেলে মা-বাবার মৃত্যুর সময় কাছে থাকার সুযোগ হয় না।
  • রাতে বাঁশ কাটা যাবে না।
  • রাতে গাছের পাতা ছিঁড়া ও ফল তোলা নিষেধ।
  • ঘর থেকে বের হয়ে বিধবা নারী চোখে পড়লে যাত্রা অশুভ হয়
  • ঘরের চৌকাঠে বসা, দারিদ্রতার লক্ষণ।
  • বিধবা নারীকে অবশ্য অবশ্যই সাদা কাপড় পরিধান করতে হবে
  • ভাঙা আয়না দিয়ে চেহারা দেখা যাবে না, তাতে অমঙ্গল হয়, চেহারার ঔজ্জ্বল্য নষ্ট হয়।
  • ডান হাতের তালু চুলকালে টাকা আসে, আর বাম হাতের তালু চুলকালে বিপদ আসে।
  • রাতের কাউকে সুঁই-সূতা দিতে নেই।
  • গেঞ্জি ও গামছা ছিঁড়ে গেলে তা সেলাই করে ব্যবহার করতে মানা
  • খালি ঘরে সন্ধ্যায় বাতি দিতে হয়, না হলে বিপদ অনিবার্য।
  • নবী করিম (সা.)-এর নাম শুনলে হাতে চুম্বন খাওয়া, তদ্রুপ মক্কা-মদিনার ছবি দেখলে চুমো খাওয়া।
  • গর্ভবতী মহিলার জন্য কোনো কিছু কাটা-কাটি কিংবা জবাই করা নিষিদ্ধ, তাতে বাচ্চা ঠোঁট কাটা জন্ম নেয়। 
  • ছোট বাচ্চাদের শরীরে লোহা জাতীয় কিছু বেঁধে দিতে হয়, তাতে সে দুষ্টু জ্বীন-শয়তানের প্রভাব থেকে রক্ষা পায়।
  • রুমাল, ছাতা, হাতঘড়ি ইত্যাদি কাউকে ধার দিতে হয় না।
  • হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলে ভাগ্যে দুর্ভোগ আছে মনে করা হয়।
  • হাত থেকে প্লেট পড়ে গেলে মেহমান আসবে বলে মনে করা।
  • তিন রাস্তার মোড়ে বসতে মানা, তাতে বংশ উজাড় হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
  • খাওয়ার সময় ঢেঁকুর আসলে অথবা খাবার আটকে গেলে কেউ তাকে স্মরণ করছে বা গালি দিচ্ছে মনে করা।
  • কাকের ডাক বিপদের পূর্বাভাস মনে করা।
  • শকূন ডাকলে বা দেখলে কেউ মারা যাবে, এটা মনে করা
  • অনুরূপভাবে পেঁচার ডাককেও বিপদের কারণ মনে করা
  • তিনজনের একসঙ্গে পথ চলা অকল্যাণজনক মনে করা।
  • দু’জনের কথার ফাঁকে টিকটিকির আওয়াজকে কথার সত্যায়ন মনে করা।
  • কারো মাথায় টোকা খেলে দ্বিতীয় বার টোকা দেওয়া আবশ্যক মনে করা, না হলে মাথায় রোগ হয় ভাবা।
  • ভাত প্লেটে নেওয়ার সময় একবার নিতে হয় না।
  • নতুন বউকে শ্বশুরালয়ে কমপক্ষে আড়াই দিন অবস্থান করতে হয়।
  • পাতিলে ভাত খেলে মেয়ে সন্তান জন্ম নেয়।
  • সকালে ঘুম থেকে উঠে ঘর ঝাড়ু দেওয়ার আগ পর্যন্ত খাওয়ার জন্য কাউকে কোনো কিছু দেওয়া নিষেধ।
  • রাতে কোনো কিছুর লেন-দেন করা ভালো নয়।
এভাবে করে অফুরন্ত কুসংস্কার চর্চা হয়ে আসছে। তাই আমাদের উচিত কোরানের অর্থ বুঝে পড়া। কারন, এটাই হলো পরিপূর্ণ জীবন বিধান। তাছাড়া জীবন চলার পথে জরুরী সহীহ্ হাদিস চর্চা করা।

আল্লাহ তালাহ আমাদের সকলকে বোঝার তৌফিক দিন। আমিন।।