খাদ্যের অভাবে পৃথিবীতে কখনও দুর্ভিক্ষ হয়নি, হয়েছে সুষম বণ্টনের অভাবে।”- কথাটি বলেছেন নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন।
কোরান-হাদিসের আলোকে দুর্ভিক্ষ ও বন্টন:
মানুষ কুরআন ও হাদিসের পথ থেকে যখনই দূরে চলে যায় তখনই নানাবিধ আজাব মানুষকে পাকড়াও করে।
সুনানে ইবনে মাজাহ-এর ৪০১৯নং হাদিসে আবদুল্লাহ বিন উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের দিকে এগিয়ে এসে বললেন :
হে মুহাজিরগণ! তোমরা কিছু বিষয়ে পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। তবে আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি যেন তোমরা তার সম্মুখীন না হও’। ওই হাদিসের বিষয় হচ্ছে-
- প্রকাশ্য অশ্লীলতায় লিপ্ত হওয়া
- ওজন বা পরিমাপে কারচুপি
- হালাল-হারাম মেনে না চলা
- জাকাত প্রদানে অনীহা
- আল্লাহ ও তার রাসূলের অঙ্গীকার ভঙ্গ
- আল্লাহর বিধানানুযায়ী বিচার না করা
রাসূল (সা.) বলেছেন : ‘যখন তোমাদের শাসকবর্গ আল্লাহর কিতাব মোতাবেক মীমাংসা না করে এবং আল্লাহর নাজিলকৃত বিধানকে গ্রহণ না করে, তখন আল্লাহ তাদের পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ বাধিয়ে দেন’। আর যুদ্ধ দুর্ভিক্ষ নিয়ে আসে।
দুর্ভিক্ষ জিনিসটি আসলে কী?
অর্থনীতিবিদদের মতে, দুর্ভিক্ষ হচ্ছে খাদ্য সরবরাহে ঘাটতির কারণে কোনো এলাকার মানুষের অনাহারজনিত চরম অবস্থা। সাধারণত কোনো এলাকায় ফসলহানি ঘটলে এবং সেখানে প্রয়োজন মেটানোর মতো খাদ্য সরবরাহ না থাকলে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়।
এছাড়াও খরা, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, অতিবৃষ্টি ইত্যাদি প্রাকৃতিক কারণে, গবাদিপশুর রোগ বা ফসলের রোগ, পশু-কীটপতঙ্গ বা ইঁদুররাও অনেক সময় দুর্ভিক্ষের জন্য দায়ী হতে পারে। এর বাইরেও ত্রুটিপূর্ণ পরিবহন ও খারাপ যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে চালু বাণিজ্যপ্রবাহে বাধা আসলে অনেক সময় দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে।
নানা বৈশ্বিক সঙ্কটের সময়ের জাতিসংঘের দিকে তাকিয়ে থাকে পুরো বিশ্ব। তারা কী করছে, কী বলছে, তা গুরুত্ব দেয়া হয় দিকনির্দেশনা হিসেবে।
যেমন,করোনাকালে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) (২৩ এপ্রিল ২০২০) বলেছে, “করোনা মহামারির কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট বিশ্বজুড়ে তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা দেখা দিতে পারে। প্রায় সাড়ে ২৬ কোটি মানুষ দুর্ভিক্ষপীড়িত হতে পারে, যা হবে বর্তমানের দ্বিগুণ। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি যে মানুষ না খেতে পেয়ে আক্ষরিক অর্থে মারা যাবে। কয়েক মাসের মধ্যেই বাইবেলে বর্ণিত পরিস্থিতির মতো একাধিক দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হতে পারি আমরা। এ কথা সত্য যে আমাদের হাতে আর সময় নেই। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে হবে। সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। চার সপ্তাহ পরই দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে। কিংবা আমরা কয়েক মাস সময় পেতে পারি। এখন জরুরি দরকার অর্থ। আর শুধু অর্থ পেলেও চলবে না। সেই সঙ্গে খাদ্য সরবরাহ করার নিশ্চয়তা লাগবে। যত দ্রুত হয়, ততই মঙ্গল।” জাতিসংঘের এই কথাকে পাত্তা না দিয়ে চরম আশাবাদী হয়ে যদি ধরেই নেই, পরিস্থিতি এতো খারাপ হবে না। তারপরেও যা হবে, তাও কিন্তু চরম চিন্তার!
করোনাভাইরাসের কারণে উদ্ভূত সঙ্কট কোন দেশ, কতো ভালোভাবে মোকাবিলা করতে পারবে, তা ওই সূচকে বোঝা যাবে বলে ধরা হচ্ছে। সেখানে দেখা গেছে, ১৩০টি দেশের মধ্যে ওই সূচক অনুযায়ী শীর্ষ তিনটি দেশ হচ্ছে নরওয়ে, ডেনমার্ক ও সুইজারল্যান্ড। আর ওই তালিকায় সবার নিচের দিকে থাকা তিনটি দেশ হচ্ছে হাইতি, ভেনেজুয়েলা ও ইথিওপিয়া।
জাতিসংঘের পক্ষ থেকে দুর্ভিক্ষ ব্যাখ্যা করা হয়েছে:
ইথিওপিয়ার মেলকাদিদা শরণার্থী শিবিরের একটি পুষ্টি কেন্দ্রে একজন নার্স তাকে ওজনের বেসিনে ওজন করার সময় সামিরা আবদি তার ছেলের দিকে তার চোখ স্থির করে। কয়েক সপ্তাহ ধরে পেটের ব্যথায় ভোগার পর তার পাঁচ সন্তানেরই অপুষ্টি ধরা পড়ে। তাদের অবিলম্বে একটি চিকিত্সা ব্যবস্থায় রাখা হয়েছিল যার মধ্যে একটি উচ্চ-পুষ্টির সম্পূরক এবং সম্পর্কিত সংক্রমণের চিকিত্সা অন্তর্ভুক্ত ছিল, কিন্তু তার মাত্র তিনটি শিশু সুস্থ হয়েছে। সামিরার বাচ্চাদের মতো, ইথিওপিয়া, কেনিয়া এবং সোমালিয়া জুড়ে প্রায় 6.6 মিলিয়ন শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভোগার ঝুঁকিতে রয়েছে।
এমন একটি বিশ্বে যেখানে আমরা প্রত্যেককে খাওয়ানোর জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য উত্পাদন করি, 828 মিলিয়ন লোক পর্যন্ত - বিশ্বের জনসংখ্যার 10 শতাংশেরও বেশি - এখনও প্রতি রাতে ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে যায়৷ 2022 সালে, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার 'জরুরি' পর্যায়ে 45 মিলিয়ন মানুষ ছিল, দুর্ভিক্ষ ঘোষণা থেকে মাত্র এক ধাপ দূরে। আফগানিস্তানে, 22.8 মিলিয়ন মানুষ (জনসংখ্যার 55 শতাংশ) তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে এবং দেশের চাহিদা ইথিওপিয়া, দক্ষিণ সুদান, সোমালিয়া এবং এমনকি ইয়েমেন সহ অন্যান্য সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ দেশগুলির চেয়েও বেশি।
দুর্ভিক্ষের কারন পর্যবেক্ষণ:
সংঘর্ষ, স্থানচ্যুতি, দীর্ঘস্থায়ী দারিদ্র্য, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জলবায়ু পরিবর্তন।
যুদ্ধ এবং সংঘাত সাধারণত দুর্ভিক্ষের প্রাথমিক চালক কারণ তারা জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির দিকে পরিচালিত করে, মানুষের খাদ্য এবং আয় অ্যাক্সেসের ঐতিহ্যগত উপায়ে ব্যাঘাত ঘটায়, মানবিক অ্যাক্সেসকে বাধা দেয় এবং অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদী পতনের দিকে ঠেলে দেয়।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ - যেমন খরা, বন্যা এবং ঘূর্ণিঝড় - এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবগুলিও দুর্ভিক্ষের দিকে নিয়ে যেতে পারে, যে অঞ্চলে জনসংখ্যার অধিকাংশই জমির বাইরে বসবাস করে সেখানে কৃষি ও পশুসম্পদ কার্যক্রমকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
আমরা প্রত্যেকেই নিজের ভুল সম্পর্কে জানি, তাই নীরবে রবের কাছে নিজের ভুল স্বীকার করে আল্লাহর দেওয়া সচ্ছলতা ও প্রাচুর্যকে অহংকারের বস্তু না বানিয়ে বরং নিয়ামত মনে করি। আর রবের সামনে বিনম্রচিত্তে সিজদায় মাথা নত করে দুর্ভিক্ষ নামক অভিশাপ থেকে সর্বাবস্থায় আল্লাহর আশ্রয় চাই।
